আইসোটোপের ধর্ম ও ব্যবহার
তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ কীভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায়, কৃষিতে, খাদ্য সংরক্ষণে আর ফসিলের বয়স নির্ণয়ে কাজে লাগে।
একই মৌলের বিভিন্ন আইসোটোপের প্রোটন ও ইলেকট্রন সংখ্যা সমান বলে আইসোটোপগুলোর মধ্যে রাসায়নিক ধর্মে তেমন পার্থক্য নেই। তবে যেহেতু তাদের ভর আলাদা তাই তাদের সহজেই শনাক্ত করা যায়।
সাধারণত আইসোটোপ অস্থায়ী। অস্থায়ী আইসোটোপ বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় রশ্মি ও কণা বিকিরণ করে। তাই এদেরকে বলা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের এ ধর্ম কাজে লাগানো হয়। নিচে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইসোটোপের ব্যবহার উল্লেখ করা হলো।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে
বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে ও নিরাময়ে আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়। কোনো ক্ষুদ্র রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কতগুলো মৌলের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ পাঠিয়ে তা শনাক্ত করা যায়। একইভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর কোন কোষ ক্যান্সার আক্রান্ত, তা আইসোটোপ দিয়ে নির্ণয় করা যায়। আবার ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ ধ্বংস করা যায় আইসোটোপের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ব্যবহার করে। এছাড়াও তেজস্ক্রিয় রশ্মি ব্যবহার করে ডাক্তারি যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করা হয়।
রোগ নির্ণয়ে কেন আইসোটোপ এত কাজের? কারণ তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের রাসায়নিক ধর্ম সাধারণ আইসোটোপের মতোই। শরীর একে চিনতে পারে না, সাধারণ পরমাণুর মতোই যেখানে যাওয়ার সেখানে নিয়ে যায়। কিন্তু এটি রশ্মি ছড়ায় বলে যন্ত্র দিয়ে বাইরে থেকে এর পথ অনুসরণ করা যায়।
| আইসোটোপ | কোথায় কাজে লাগে |
|---|---|
| কোবাল্ট-৬০ | গামা রশ্মি দিয়ে ক্যান্সারের চিকিৎসা; চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ও খাদ্য জীবাণুমুক্ত করা |
| আয়োডিন-১৩১ | থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা |
| টেকনেসিয়াম-৯৯m | হাড়, কিডনি ও হৃৎপিণ্ডের স্ক্যান; রোগ নির্ণয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত |
| ফসফরাস-৩২ | উদ্ভিদ কীভাবে সার শোষণ করে তা দেখা (চিত্র ৬.৩) |
| কার্বন-১৪ | ফসিল ও পুরনো জিনিসের বয়স নির্ণয় |
কৃষিক্ষেত্রে
কৃষিক্ষেত্রে পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে আইসোটোপের তেজস্ক্রিয় রশ্মি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কখন কোন সার কী পরিমাণ ব্যবহার করতে হবে তা জানতে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়।
এভাবে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান কোন সার গাছ কত দ্রুত আর কতটা শোষণ করে, কোন সময়ে সার দিলে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। ফলে কম সারে বেশি ফসল পাওয়া যায়, আর বাড়তি সার মাটি ও পানিকে দূষিত করে না।
খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে
ব্যাকটেরিয়াসহ অনেক জীবাণু তেজস্ক্রিয় রশ্মিতে মারা যায়। তাই তেজস্ক্রিয় রশ্মি ব্যবহার করে খাদ্যদ্রব্য বা ফলমূলকে জীবাণুমুক্ত করে সংরক্ষণ করা হয়।
ভূ-তাত্ত্বিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজে
তোমরা অনেক সময় খবরে শুনে থাক যে, কোনো দেশে কয়েক কোটি বছরের পুরনো ফসিল পাওয়া গেছে। কীভাবে বিজ্ঞানীরা জানেন যে, ফসিলটি কত বছরের পুরনো? এটি জানা যায় আইসোটোপের ক্ষয় থেকে। কোনো ফসিলে স্থায়ী ও অস্থায়ী আইসোটোপের অনুপাত থেকে বোঝা যায় ফসিলটি কত বছরের পুরনো।
একটি তেজস্ক্রিয় পরমাণু ঠিক কখন ভাঙবে, আগে থেকে বলা যায় না। কিন্তু অনেকগুলো একসাথে থাকলে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর ঠিক অর্ধেক ভেঙে যায়।
জীবিত অবস্থায় প্রতিটি উদ্ভিদ ও প্রাণী খাদ্য ও শ্বাসের মাধ্যমে কার্বন গ্রহণ করে, তাই তার দেহে স্থায়ী কার্বন-১২ আর অস্থায়ী কার্বন-১৪ এর অনুপাত বাতাসের মতোই থাকে। মৃত্যুর পর নতুন কার্বন আসা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দেহের কার্বন-১৪ ভাঙতেই থাকে। তাই কোনো হাড় বা কাঠে কার্বন-১৪ যত কম, সেটি তত পুরনো। নিচের সিমুলেশনে ৪০০টি কার্বন-১৪ পরমাণুকে ভাঙতে দেখো।
প্রতিটি বেগুনি বিন্দু একটি কার্বন-১৪ নিউক্লিয়াস। কোনটি কখন ভেঙে নাইট্রোজেন-১৪ হবে আগে থেকে বলা যায় না, তবু প্রতি ৫,৭৩০ বছরে প্রায় অর্ধেক বদলে যায়। চালাও চেপে দেখো।
বাকি কার্বন-১৪ (%)
সময় (হাজার বছর), প্রতিটি দাগ এক অর্ধায়ু
একটি প্রাচীন কাঠের টুকরায় কার্বন-১৪ এর পরিমাণ জীবিত গাছের তুলনায় এক-চতুর্থাংশ ()। কাঠটি আনুমানিক কত বছর আগের?
প্রতি অর্ধায়ুতে কার্বন-১৪ অর্ধেক হয়: । অর্থাৎ দুটি অর্ধায়ু পার হয়েছে।
বয়স বছর, অর্থাৎ প্রায় ১১ হাজার ৫০০ বছর।
তেজস্ক্রিয় রশ্মি দেওয়া ফল অনেক দিন ভালো থাকে কেন?
ফল পচে প্রধানত ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের মতো জীবাণুর কারণে। তেজস্ক্রিয় রশ্মিতে এসব জীবাণু মারা যায়, তাই ফলটি জীবাণুমুক্ত থাকে এবং দেরিতে পচে।
আইসোটোপগুলোর রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই হওয়া সত্ত্বেও তাদের শনাক্ত করা যায় কীভাবে?
আইসোটোপগুলোর ভর আলাদা, তাই ভর মেপে তাদের আলাদা করা যায়। আবার তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ রশ্মি ছড়ায়, যা গাইগার কাউন্টার বা গামা ক্যামেরার মতো যন্ত্রে ধরা পড়ে।
Check yourself
11 questions from this lesson. Every question of the chapter is in its Exercises.
অস্থায়ী আইসোটোপকে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বলা হয় কেন?
চিকিৎসা ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে
- i. ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র রক্তনালি শনাক্ত করা যায়
- ii. ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ ধ্বংস করা যায়
- iii. ডাক্তারি যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করা যায়
নিচের কোনটি সঠিক?
তেজস্ক্রিয় রশ্মি দিয়ে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করা যায় কেন?
কৃষিক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে কী জানা যায়?
কোনো ফসিল কত বছরের পুরনো তা কীভাবে বোঝা যায়?
একটি নমুনায় ৮০০টি কার্বন-১৪ পরমাণু আছে। দুটি অর্ধায়ু (১১,৪৬০ বছর) পরে গড়ে কয়টি কার্বন-১৪ পরমাণু বাকি থাকবে?
তেজস্ক্রিয় রশ্মি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা খাবার নিজেই তেজস্ক্রিয় হয়ে যায়।
একই মৌলের বিভিন্ন আইসোটোপের রাসায়নিক ধর্মে তেমন পার্থক্য নেই।
কোনো তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের পরমাণুগুলোর অর্ধেক ভেঙে যেতে যে সময় লাগে, তাকে কী বলে?
আমাদের জীবনে আইসোটোপের অবদান তিনটি উদাহরণ দিয়ে লেখো।
রাফির নানুর থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা নির্ণয়ের জন্য ডাক্তার তাঁকে নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রে পাঠালেন। সেখানে খুব সামান্য তেজস্ক্রিয় আয়োডিন খাইয়ে একটি যন্ত্রে পরীক্ষা করা হলো। ফেরার পথে জাদুঘরে রাফি দেখল, একটি প্রাচীন কাঠের নৌকার পাশে লেখা আছে, কার্বন-১৪ মেপে জানা গেছে এর বয়স প্রায় ৫,৭৩০ বছর।
- ক.১
তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ কাকে বলে?
- খ.২
আইসোটোপগুলোর রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই হলেও তাদের শনাক্ত করা যায় কেন?
- গ.৩
নৌকার কাঠে এখন জীবিত গাছের তুলনায় কত অংশ কার্বন-১৪ আছে? ব্যাখ্যা করো।
- ঘ.৪
উদ্দীপকের দুটি ঘটনার আলোকে আমাদের জীবনে আইসোটোপের অবদান মূল্যায়ন করো।
Finished reading?
Mark the lesson as done to add it to your progress. It is saved in this browser.
